প্রসঙ্গ: একাত্তরের বুদ্ধিজীবি হত্যা
পাক-বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস কর্তৃক সংগঠিত তালিকাভূক্ত বুদ্ধিজীবিদের হত্যাযজ্ঞের স্বরণে বাঙালি জাতি স্বশ্রদ্ধ চিত্তে সেই ১৯৭২ সাল থেকে ১৪ই ডিসেম্বরে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস পালন করে আসছে । বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মরহুম তাজউদ্দিন আহমেদ, ১৪ই ডিসেম্বরকে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস ঘোষনা করেছিলেন কারণ, অপহরণ ও পরে নির্বিচারে হত্যা এই ১৪ই ডিসেম্বরেই অর্থ্যাৎ পাক-বাহিনীর আত্ম-সমর্পন এবং বাঙালির বিজয় অর্জন তথা বিজয় দিবসের ঠিক দু’দিন পূর্বে, সংগঠিত হয়েছিল সবচেয়ে বেশী।
২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১ –এ, মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ১৬ই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পনের পূর্বে পাক-বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা মিলে ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে । ১৯৯৪ সালে পুণ:মুদ্রিত বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবি সম্পর্কিত তথ্যকোষ ”শহীদ বুদ্ধিজীবি কোষগ্রন্থ” এ শহীদ বুদ্ধিজীবিদের সংখ্যা ২৩২ জন উল্লেখ আছে এবং এই তালিকাটি সর্বমোট নয় এমনকি সম্পূর্ণ নয় ।
এই তথ্যকোষে শহীদ আখ্যায়িত হয়েছেন তারা যাদের পাক-বাহিনী এবং দোসরেরা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) বিভিন্ন সময় নির্বিচারে হত্যা করেছিল এবং যারা ২৫শে মার্চ ১৯৭১ থেকে ৩১শে জানুয়ারী ১৯৭২ সময়কাল থেকে নিঁখোজ । লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, সংগীত শিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, উকিল, চিকিৎসক, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি-বেসরকারি কর্মী, নাট্য-কর্মী, জনসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বুদ্ধিজীবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ”বাংলাদেশ” নামক প্রামান্য চিত্রে বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক, ২৭০ জন সেকেন্ডারি স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ-শিক্ষককে হত্যা করা হয়।

এ ব্যাপারটি পরিস্কার ছিল যে, পরাজয় সন্নিকটে জেনে, পাক-বাহিনী এবং তার দোসরেরা বুদ্ধিজীবি নিধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসে এবং একজনের পর একজনকে হত্যা করে এবং তা বেশীর ভাগই সংগঠিত হয় এই ১৪ই ডিসেম্বরে। এই হত্যাযজ্ঞ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল মূলত জাতি হিসেবে আমাদের মেধাহীন, পঙ্গু করে দেয়া।
দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে, ১৮ই ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে, রায়ের বাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষত-বিক্ষত লাশের একটি গণ-কবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নীচে চাপা পড়ে ছিল । লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিস্কার করে, যা ছিল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়ের এবং সাংবাদিক মুহাম্মদ আখতার - পচনশীল লাশগুলো পরিবার কর্তৃক সনাক্ত করা হয় সেদিনই । সাংবাদিক সেলিনা পারভিন এর লাশ সনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মহি এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলী’র লাশ পরবর্তীতে চিহ্নিত করা হয়। লাশ সনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবিদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন।
এরকম আরো বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়ের বাজার এলাকায়, তেঁজগাঁও এর কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টি.বি. হাসপাতাল সহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরবর্তীতে সনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিলনা । এসময় সংবাদপত্রগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবিদের (নভেম্বরের শেষের দিকে এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপহরণ অথবা গেফতারকৃত) নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল।
পাক-বাহিনী এদেশের তরুণ ছেলে-মেয়েদেরকে হত্যা করা শুরু করেছিল সেই ২৫শে মার্চের সময় থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য এবং অনেক প্রফেসরদের হত্যা করা হয় । মূলত যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়েই চলে বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ড। এমনকি পাক-বাহিনীর দোসরদের (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় ১৯৭২ এর জানুয়ারীতেও।
চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তার অপহরণকৃত ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারকে (পাক-বাহিনীরা তাকেও হত্যা করেছিল বলে ধারনা করা হয়) খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। তাকে শেষ দেখা যায় মিরপুরে বিহারী ও পাক-বাহিনীর দোসরদের ক্যাম্পে। পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ডা: মনসুর আলীকে ২১শে ডিসেম্বর এবং সাংবাদিক গোলাম রহমানকে ১১ই জানুয়ারী হত্যা করা হয়।
*** *** *** *** *** *** *** ***
ব্লগার খোমেনী ইহসান -এর পুরো পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার একটি মন্তব্য (সামহোয়্যার ব্লগ থেকে) তুলে ধরছি :
শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. হুমায়ুন কবির আমার ফুফাতো ভাই। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংসদ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলায় তার মামা আমিমুল ইহ্সানের (আমার পিতা) শ্বশুর বাড়িতে থেকে তিনি এখানে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেন ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। প্রয়োজনীয় কাজে ঢাকায় আসলে হাতির পুল বাজারস্থ বাড়ি থেকে বের হয়ে ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে মতিঝিলে তার ক্ষত-বিক্ষত লাশ পাওয়া যায়।
তার নামে শরীয়তপুর জেলার ভেদর উপজেলার চর ভাগা ইউনিয়নে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা, হুমায়ুন কবীর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ স্কুলটি শরীয়তপুর জেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল। এ বছরের বর্ষায় নদী ভাঙ্গনে স্কুলটি বিলীন হয়ে গেছে। তবে সখিপুরে স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়েছে।
আমাদের পরিবারে তৎকালীন সকল সক্ষম পুরুষই মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। এর মধ্যে আমার বড় জ্যাঠা ডা. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা চাঁদুপুরে পাকিস্তানীদের একটি জাহাজ লুট করায় নেতৃত্ব দেন।
*** *** *** *** *** *** *** ***
মফিজউদ্দিনের (লাশ বহনকারী বাহনের চালক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আশরাফুজ্জামান খান, ইসলামি ছাত্র সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য এবং পাকিস্তান রেডিও’র সাবেক কর্মী, নিজ হাতে সাত জন শিক্ষককে গুলি করেন। মফিজউদ্দনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এমন দূর্ভাগ্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণকারী শিক্ষকদের লাশ উদ্ধার করা হয় রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ির গণ কবর থেকে। তার ডায়রীতে ২০ জন শিক্ষক সহ আরো অনেক বাঙালির তালিকা ছিল। তার ডায়রীতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিল যারা পাক-বাহিনীকে সহযোগীতা করেছিল।
বুদ্ধিজীবি হত্যা পরিকল্পনায় পাক-বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাসেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিল মূল হোতা । নভেম্বর মাসের কোন এক সময় তারা মওলানা আব্দুল মান্নানের বাসগৃহে মাদ্রাসা শিক্ষক সংঘের প্রেসিডেন্ট সহকারে বৈঠক করে। এই আলোচনাতেই সম্ভবত বুদ্ধিজীবিদের হত্যার মূল পরিকল্পনা করা হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ
* এ.এন.এম. মুনির চৌধুরী
* ডা: জি.সি. দেব
* মুফাজ্জাল হায়দার চৌধুরী
* আনোয়ার পাশা
* জোতীর্ময় গুহ ঠাকুর
* আব্দুল মুক্তাদীর
* এস.এম. রাশিদুল হাসান
* ডা: এ.এন.এম ফাইজুল মাহি
* ফজলুর রহমান খান
* এ.এন.এম মনিরুজ্জামান
* ডা: সেরাজুল হক খান
* ডা: শাহাদাত আলী
* ডা: এম.এ. খায়ের
* এ.আর. খান কাদিম
* মোহাম্মদ সাদিক
* শারাফত আলী
* গিয়াসউদ্দিন আহমেদ
* আনন্দ পবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ
* প্রফেসর কাইয়ূম
* হাবিবুর রহমান
* শ্রী সুখ রঞ্জন সমদ্দার
এম.সি.এ
* মশিউর রহমান
* আমজাদ হোসেন
* আমিনুদ্দিন
* নাজমুল হক সরকার
* আব্দুল হক
* সৈয়দ আনোয়ার আলী
* এ.কে. সর্দার
সাংবাদিক
* সিরাজুদ্দিন হোসেন
* শহীদুল্লাহ কায়সার
* খন্দকার আবু তালেব
* নিজামুদ্দিন আহমেদ
* এ.এন.এম. গোলাম মোস্তফা
* শহীদ সাবের
* সরকার আব্দুল মান্নান (লাদু)
* নাজমুল হক
* এম. আখতার
* আব্দুল বাশার
* চিশতী হেলালুর রহমান
* শিবসাধন চক্রবর্তী
* সেলিনা আখতার
চিকিৎসক
* মো: ফজলে রাব্বী
* আব্দুল আলীম চৌধুরী
* সামসুদ্দিন আহমেদ
* আজহারুল কবীর
* সোলায়মান খান
* কায়সার উদ্দিন
* মনসুর আলী
* গোলাম মর্তোজা
* হাফেজ উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
* আব্দুল জব্বার
* এস.কে. লাল
* হেম চন্দ্র বসাক
* কাজী ওবায়দুল হক
* আল-হাজ্ব মমতাজউদ্দিন
* ঘাশিময় হাযরা
* নড়েন ঘোষ
* জিকরুল হক
* শামসুল হক
* এম. ওহমান
* এ. গফুর
* মনসুর আলী
* এস.কে সেন
* মফিজউদ্দিন
* আমূল কুমার চক্রবর্তী
* আতিকুর রহমান
* গোলাম সারওয়ার
* এর.সি. দাস
* মিহির কুমার সেন
* সালেহ আহমেদ
* অনীল কুমার সিনহা
* গুনীল চন্দ্র শর্মা
* এ.কে.এম. গোলাম মোস্তফা
* মাকবুল আহমেদ
* এনামুল হক
* এনসুর (কানু)
* আশরাফ আলী তালুকদার
* লেফ: জিয়াউর রহমান
* লেফ.ক. জাহাঙ্গীর
* বাদল আলম
* লেফ: ক. হাই
* মেজর রেজাউর রহমান
* মেজর নাজমুল ইসলাম
* আসাদুল হক
* নাজির উদ্দিন
* লেফ: নুরুল ইসলাম
* কাজল ভাদ্র
* মনসুর উদ্দিন
শিক্ষাবিদ
* জহির রায়হান
* পূর্নেন্দু দস্তিদর
* ফেরদৌস দৌলা
* ইন্দু সাহা
* মেহেরুন্নিসা
শিল্পী ও পেশাজীবি
আলতাফ মাহমুদ
দানবীর রানাদা প্রসাদ সাহা
জোগেষ চন্দ্র ঘোষ
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত
সামসুজ্জামান
মাহবুব আহমেদ
খুরশিদ আলম
নজরুল ইসলাম
মাহফুজুল হক চৌধুরী
মহসিন আলী
মুজিবুল হক
--------------
তথ্যসূত্র :
১. জেনোসাইড বাংলাদেশ
২. বিদ্রোহী
২০শে ডিসেম্বর ১৯৭১ –এ, মুজিবনগর সরকারের এক মুখপাত্র জানান, ১৬ই ডিসেম্বরে আত্মসমর্পনের পূর্বে পাক-বাহিনী এবং তাদের সহযোগীরা মিলে ৩৬০ জন বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে । ১৯৯৪ সালে পুণ:মুদ্রিত বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত শহীদ বুদ্ধিজীবি সম্পর্কিত তথ্যকোষ ”শহীদ বুদ্ধিজীবি কোষগ্রন্থ” এ শহীদ বুদ্ধিজীবিদের সংখ্যা ২৩২ জন উল্লেখ আছে এবং এই তালিকাটি সর্বমোট নয় এমনকি সম্পূর্ণ নয় ।
এই তথ্যকোষে শহীদ আখ্যায়িত হয়েছেন তারা যাদের পাক-বাহিনী এবং দোসরেরা (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) বিভিন্ন সময় নির্বিচারে হত্যা করেছিল এবং যারা ২৫শে মার্চ ১৯৭১ থেকে ৩১শে জানুয়ারী ১৯৭২ সময়কাল থেকে নিঁখোজ । লেখক, বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী, সংগীত শিল্পী, শিক্ষক, গবেষক, সাংবাদিক, উকিল, চিকিৎসক, স্থপতি, ভাস্কর, সরকারি-বেসরকারি কর্মী, নাট্য-কর্মী, জনসেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বুদ্ধিজীবি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ১৯৭২ সালে সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ”বাংলাদেশ” নামক প্রামান্য চিত্রে বলা হয়, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক, ২৭০ জন সেকেন্ডারি স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ-শিক্ষককে হত্যা করা হয়।

এ ব্যাপারটি পরিস্কার ছিল যে, পরাজয় সন্নিকটে জেনে, পাক-বাহিনী এবং তার দোসরেরা বুদ্ধিজীবি নিধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এবং শিক্ষক, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে আসে এবং একজনের পর একজনকে হত্যা করে এবং তা বেশীর ভাগই সংগঠিত হয় এই ১৪ই ডিসেম্বরে। এই হত্যাযজ্ঞ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল মূলত জাতি হিসেবে আমাদের মেধাহীন, পঙ্গু করে দেয়া।
দৈনিক পত্রিকাগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে ডিসেম্বরের দ্বিতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গোপন তথ্যসূত্রের ভিত্তিতে, ১৮ই ডিসেম্বরে একদল সাংবাদিক ঢাকার পশ্চিমে, রায়ের বাজার এলাকায় পচনশীল, ক্ষত-বিক্ষত লাশের একটি গণ-কবরের সন্ধান লাভ করে। জাতির মেধাবী ব্যক্তিবর্গের দেহগুলো অত্যাচারের সুস্পষ্ট চিহ্ন নিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, একে-অন্যের নীচে চাপা পড়ে ছিল । লালমাটিয়ায় শারীরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সাংবাদিকরা একটি বন্দীশালা আবিস্কার করে, যা ছিল রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।
ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এবং কামালউদ্দিন, চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আব্দুল আলিম চৌধুরী, আবুল খায়ের এবং সাংবাদিক মুহাম্মদ আখতার - পচনশীল লাশগুলো পরিবার কর্তৃক সনাক্ত করা হয় সেদিনই । সাংবাদিক সেলিনা পারভিন এর লাশ সনাক্ত করা হয় পরের দিন। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক, ফাইজুল মহি এবং চিকিৎসক গোলাম মুর্তোজা, আজহারুল হক, হুমায়ুন কবীর ও মনসুর আলী’র লাশ পরবর্তীতে চিহ্নিত করা হয়। লাশ সনাক্তকরণের সময় শহীদ বুদ্ধিজীবিদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছিলেন।
এরকম আরো বধ্যভূমি ছিল মিরপুর এবং রায়ের বাজার এলাকায়, তেঁজগাঁও এর কৃষি বর্ধিতকরণ বিভাগের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মহাখালীর টি.বি. হাসপাতাল সহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। অনেক লাশই পরবর্তীতে সনাক্তকরণের পর্যায়ে ছিলনা । এসময় সংবাদপত্রগুলো নিখোঁজ বুদ্ধিজীবিদের (নভেম্বরের শেষের দিকে এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপহরণ অথবা গেফতারকৃত) নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করছিল।
পাক-বাহিনী এদেশের তরুণ ছেলে-মেয়েদেরকে হত্যা করা শুরু করেছিল সেই ২৫শে মার্চের সময় থেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য এবং অনেক প্রফেসরদের হত্যা করা হয় । মূলত যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়েই চলে বুদ্ধিজীবি হত্যাকাণ্ড। এমনকি পাক-বাহিনীর দোসরদের (রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস) দ্বারা এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় ১৯৭২ এর জানুয়ারীতেও।
চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান তার অপহরণকৃত ভাই শহিদুল্লাহ কায়সারকে (পাক-বাহিনীরা তাকেও হত্যা করেছিল বলে ধারনা করা হয়) খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। তাকে শেষ দেখা যায় মিরপুরে বিহারী ও পাক-বাহিনীর দোসরদের ক্যাম্পে। পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। ডা: মনসুর আলীকে ২১শে ডিসেম্বর এবং সাংবাদিক গোলাম রহমানকে ১১ই জানুয়ারী হত্যা করা হয়।
*** *** *** *** *** *** *** ***
ব্লগার খোমেনী ইহসান -এর পুরো পরিবারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার একটি মন্তব্য (সামহোয়্যার ব্লগ থেকে) তুলে ধরছি :
শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. হুমায়ুন কবির আমার ফুফাতো ভাই। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ সংসদ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলায় তার মামা আমিমুল ইহ্সানের (আমার পিতা) শ্বশুর বাড়িতে থেকে তিনি এখানে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেন ও যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। প্রয়োজনীয় কাজে ঢাকায় আসলে হাতির পুল বাজারস্থ বাড়ি থেকে বের হয়ে ১৫ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে মতিঝিলে তার ক্ষত-বিক্ষত লাশ পাওয়া যায়।
তার নামে শরীয়তপুর জেলার ভেদর উপজেলার চর ভাগা ইউনিয়নে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা, হুমায়ুন কবীর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ স্কুলটি শরীয়তপুর জেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল। এ বছরের বর্ষায় নদী ভাঙ্গনে স্কুলটি বিলীন হয়ে গেছে। তবে সখিপুরে স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়েছে।
আমাদের পরিবারে তৎকালীন সকল সক্ষম পুরুষই মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। এর মধ্যে আমার বড় জ্যাঠা ডা. আবুল কালাম আজাদ মোল্লা চাঁদুপুরে পাকিস্তানীদের একটি জাহাজ লুট করায় নেতৃত্ব দেন।
*** *** *** *** *** *** *** ***
মফিজউদ্দিনের (লাশ বহনকারী বাহনের চালক) স্বীকারোক্তি অনুযায়ী আশরাফুজ্জামান খান, ইসলামি ছাত্র সংস্থার কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য এবং পাকিস্তান রেডিও’র সাবেক কর্মী, নিজ হাতে সাত জন শিক্ষককে গুলি করেন। মফিজউদ্দনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এমন দূর্ভাগ্যজনক ভাবে মৃত্যুবরণকারী শিক্ষকদের লাশ উদ্ধার করা হয় রায়ের বাজার বধ্যভূমি এবং মিরপুরের শিয়াল বাড়ির গণ কবর থেকে। তার ডায়রীতে ২০ জন শিক্ষক সহ আরো অনেক বাঙালির তালিকা ছিল। তার ডায়রীতে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ১৬ জন শিক্ষকের নাম ছিল যারা পাক-বাহিনীকে সহযোগীতা করেছিল।
বুদ্ধিজীবি হত্যা পরিকল্পনায় পাক-বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার কাসেম এবং ক্যাপ্টেন কাইয়ুম ছিল মূল হোতা । নভেম্বর মাসের কোন এক সময় তারা মওলানা আব্দুল মান্নানের বাসগৃহে মাদ্রাসা শিক্ষক সংঘের প্রেসিডেন্ট সহকারে বৈঠক করে। এই আলোচনাতেই সম্ভবত বুদ্ধিজীবিদের হত্যার মূল পরিকল্পনা করা হয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবিদের তালিকা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ
* এ.এন.এম. মুনির চৌধুরী
* ডা: জি.সি. দেব
* মুফাজ্জাল হায়দার চৌধুরী
* আনোয়ার পাশা
* জোতীর্ময় গুহ ঠাকুর
* আব্দুল মুক্তাদীর
* এস.এম. রাশিদুল হাসান
* ডা: এ.এন.এম ফাইজুল মাহি
* ফজলুর রহমান খান
* এ.এন.এম মনিরুজ্জামান
* ডা: সেরাজুল হক খান
* ডা: শাহাদাত আলী
* ডা: এম.এ. খায়ের
* এ.আর. খান কাদিম
* মোহাম্মদ সাদিক
* শারাফত আলী
* গিয়াসউদ্দিন আহমেদ
* আনন্দ পবন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ
* প্রফেসর কাইয়ূম
* হাবিবুর রহমান
* শ্রী সুখ রঞ্জন সমদ্দার
এম.সি.এ
* মশিউর রহমান
* আমজাদ হোসেন
* আমিনুদ্দিন
* নাজমুল হক সরকার
* আব্দুল হক
* সৈয়দ আনোয়ার আলী
* এ.কে. সর্দার
সাংবাদিক
* সিরাজুদ্দিন হোসেন
* শহীদুল্লাহ কায়সার
* খন্দকার আবু তালেব
* নিজামুদ্দিন আহমেদ
* এ.এন.এম. গোলাম মোস্তফা
* শহীদ সাবের
* সরকার আব্দুল মান্নান (লাদু)
* নাজমুল হক
* এম. আখতার
* আব্দুল বাশার
* চিশতী হেলালুর রহমান
* শিবসাধন চক্রবর্তী
* সেলিনা আখতার
চিকিৎসক
* মো: ফজলে রাব্বী
* আব্দুল আলীম চৌধুরী
* সামসুদ্দিন আহমেদ
* আজহারুল কবীর
* সোলায়মান খান
* কায়সার উদ্দিন
* মনসুর আলী
* গোলাম মর্তোজা
* হাফেজ উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
* আব্দুল জব্বার
* এস.কে. লাল
* হেম চন্দ্র বসাক
* কাজী ওবায়দুল হক
* আল-হাজ্ব মমতাজউদ্দিন
* ঘাশিময় হাযরা
* নড়েন ঘোষ
* জিকরুল হক
* শামসুল হক
* এম. ওহমান
* এ. গফুর
* মনসুর আলী
* এস.কে সেন
* মফিজউদ্দিন
* আমূল কুমার চক্রবর্তী
* আতিকুর রহমান
* গোলাম সারওয়ার
* এর.সি. দাস
* মিহির কুমার সেন
* সালেহ আহমেদ
* অনীল কুমার সিনহা
* গুনীল চন্দ্র শর্মা
* এ.কে.এম. গোলাম মোস্তফা
* মাকবুল আহমেদ
* এনামুল হক
* এনসুর (কানু)
* আশরাফ আলী তালুকদার
* লেফ: জিয়াউর রহমান
* লেফ.ক. জাহাঙ্গীর
* বাদল আলম
* লেফ: ক. হাই
* মেজর রেজাউর রহমান
* মেজর নাজমুল ইসলাম
* আসাদুল হক
* নাজির উদ্দিন
* লেফ: নুরুল ইসলাম
* কাজল ভাদ্র
* মনসুর উদ্দিন
শিক্ষাবিদ
* জহির রায়হান
* পূর্নেন্দু দস্তিদর
* ফেরদৌস দৌলা
* ইন্দু সাহা
* মেহেরুন্নিসা
শিল্পী ও পেশাজীবি
আলতাফ মাহমুদ
দানবীর রানাদা প্রসাদ সাহা
জোগেষ চন্দ্র ঘোষ
ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত
সামসুজ্জামান
মাহবুব আহমেদ
খুরশিদ আলম
নজরুল ইসলাম
মাহফুজুল হক চৌধুরী
মহসিন আলী
মুজিবুল হক
--------------
তথ্যসূত্র :
১. জেনোসাইড বাংলাদেশ
২. বিদ্রোহী
লেখক আইরিন সুলতানা
- আইরিন সুলতানা -এর ব্লগ
- ৬১ টি মন্তব্য
- ১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১০:৪৫
- মুক্তিযুদ্ধ
- গড় রেটিং: ১০
প্রিন্ট করুন
- ৬১ টি মন্তব্য
-
মাভেরিক১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ০১:২৩
মাঝে মাঝে এরকম পোস্ট চাই, অন্তত রিপোস্ট হলেও।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। জাতির চেতনা সমুন্নত থাকুক। -
শিবলু হক১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১১:০৩
সালাম আপনাকে। চমৎকার উদ্যোগ নেয়ার জন্য। সরকারকে এভাবে প্রতিটা মুহূর্তে চাপে রাখতে হবে। বিচার না হলে প্রকৃতিতেও আইনের ধারাবাহিকতা তৈরি হবেনা। -
রিসাত১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১১:০৭
এই পোস্ট গুলা অসাধারণ হচ্ছে,,, প্রতিদিন একটা করে কেউ না কেউ এধরণের পোস্ট চালিয়ে যেতে পারলে বেশ ভালো হবে -
তাহমিদুর রহমান১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১১:৩৬
অসাধারন একটা পোষ্ট । খুব ভাল লেগেছে । সরি রফিকুল ভাই। আপনার লেখা রিপিট করতে হল। -
না মানুষ১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১১:৪৬
এই পোস্টটার জন্য শুধু ধন্যবাদ নয়। আমি আপনাকে ''লাল সবুজ'' সালাম জানাচ্ছি। -
পার্থসারথি১৫ জানুয়ারি ২০০৯, ১১:৫৭
তথ্য সমৃদ্ধ পোস্টের জন্য অনেক ধন্যবাদ। কষ্ট লাগে এমন নারকীয় ঘটনার নায়করা এখনও বাংলার মাটিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। -
প্রদীপ২৪ জানুয়ারি ২০০৯, ০২:২৮
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখন ই দরকার। আমাদের সম্মিলিত প্রয়াস ই পারবে এই কাজ কে সহজ করে দিতে। -
ভালবাসার দেয়াল১৩ ডিসেম্বর ২০১০, ১৮:২১
এই লিখাটি আসলেই স্বয়ংসম্পুর্ন। লিখাটি নির্বাচিত হওয়াতে ভাল লাগছে।
তথ্যবহুল পোষ্ট

-
লিটন দেব জয়১৩ ডিসেম্বর ২০১০, ২০:৩৫
সোকেসে রাখলাম। প্রয়োজনে কাজে আসবে.........
হারামীদের (রাজাকার+বদরকার) মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি আসবে না। কবে সে দিন আসবে।
ধন্যবাদ আপনাকে -
যাযাবর জোনাক১৩ ডিসেম্বর ২০১০, ২২:৫৮
শ্রদ্ধাঞ্জলি,বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি।
ধিক্কার জানাই,মনুষ্যরূপী পিচাশ হায়েনাদের।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী নর-পিচাশদের ফাঁসি চাই। -
গেঁয়ো দরবারী১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ০০:২২
সঠিক সময়ে,সঠিক পোষ্ট। নিঃস্বন্দেহে তথ্যবহুল।
ওদের ফাসি দিতেই হবে।
সাকাচৌ গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না এদের বিচার হবে। -
গেঁয়ো দরবারী১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ০০:৩৮
সঠিক সময়ে,সঠিক পোষ্ট। নিঃস্বন্দেহে তথ্যবহুল।
ওদের ফাসি দিতেই হবে।
সাকাচৌ গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না এদের বিচার হবে। -
রশীদ জামীল১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ০১:১৪
যুদ্ধাপরাধীর বিচার দেশের সবাই চায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সরকার কি চায়?
বারবার স্লো-মোশন রিপ্লে দেখতে দেখতে মনে এই সন্দেহটা জাগছে!
খুব করে চাইবো আমার এই ধারণাটি যেনো মিথ্যে প্রমাণিত হয়। -
পুঁচকে১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ১২:১৮
ধন্যবাদ অবশ্যই।
আমরা যারা নতুন বা মিস করেছি তাদের এরকম একটি েলখা পড়ার সুযোগ করে দেবার জন্য -
কবির য়াহমদ১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ১০:৫৮
গোবিন্দ চন্দ্র দেব (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৭ – মার্চ ২৬, ১৯৭১) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনবিদ্যার একজন অধ্যাপক ছিলেন। তিনি জি সি দেব নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবী-সম্প্রদায়কে ধবংস করার একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাকিস্তানী সৈন্যরা ক্ষণজন্মা মনিষী , আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দার্শনিক ড গোবিন্দ চন্দ্র দেবকে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ ‘৭১ প্রথম প্রহরে হত্যা করেছিল।
জি.সি. দেব তদানিন্তন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের পঞ্চখান্দা পরগনার (বর্তমানে বাংলাদেশের সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা) গ্রাম লাউতাতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন( ১ফেব্রুয়ারী,১৯০৭)
তার পূর্বসূরীগণ ছিলেন উচ্চগোত্রীয় ব্রাহ্মণ যারা গুজরাট থেকে সিলেট এসেছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর জি,সি দেব স্থানীয় মিশনারীদের তত্ত্বাবধানে বড় হন।
জি,সি দেব তার শৈশবেই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯২৫ সালে বিয়ানীবাজার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলকাতার রিপন কলেজ থেকে তিনি ১৯২৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯২৯ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস এবং ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে মার্স্টাস সম্পন্ন করেন। জিসি দেব ১৯৪৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন।
ড. জি,সি দেব কোলকাতা রিপন কলেজের শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ২য় মহাযুদ্ধকালীন সময়ে রিপন কলেজ কোলকাতা থেকে দিনাজপুর স্থানান্তরিত হলে তিনিও কর্মসূত্রে দিনাজপুর আসেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষে রিপন কলেজ পুনরায় কোলকাতায় স্থানান্তরের সময় তিনি দিনাজপুরে থেকে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং সুরেন্দ্রনাথ কলেজের (দিনাজপুর) প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেব যোগদান করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের জুলাইয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি পূর্বতন ঢাকা হলের (বর্তমান- শহীদুল্লাহ হল) হাউস টিউটর হিসেবে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দ্বায়িত্ব পালন করেন, পরবর্তীতে একই বছর তিনি জগন্নাথ হলের প্রভোস্টের দ্বায়িত্ব পান। ড. দেব ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের চেয়্যায়ম্যানের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৬৭ সালে প্রফেসর পদে পদান্নতি লাভ করেন।
ষাটের দশকের শেষের দিকে ড. দেব পেনসেলভেনিয়ার wilkes-Barre কলেজে শিক্ষকতা করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সেখানে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং সেখানে তার গুণমুগ্ধরা তার মানবিক দর্শন প্রচারের লক্ষ্যে The Govinda Dev Foundation for World Brotherhood প্রতিষ্ঠা করে।
ড. দেব ১৯৬০ থেকে আমৃত্যু পাকিস্তান দর্শন সমিতির নির্বাচিত সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করে গেছেন। শহীদ ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব তার মৃত্যুর পূর্বে দর্শন গবেষণা, বিশেষ করে মানব কল্যাণ, সামাজিক প্রগতি, বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বশান্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের অনুকূলে তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ৫০% উইল করে দিয়ে যান। তার উইলকৃত অর্থে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে দর্শন বিভাগে প্রতিষ্ঠিত হয় ” দেব সেন্টার ফর ফিলসফিক্যাল স্টাডিজ “। এই কেন্দ্রের উদ্যোগে নিয়মিত ভাবে “দর্শন ও প্রগতি” নামে একটি বাংলা এবং Phylosophy and Progress নামে একটি ইংরেজি জার্নাল প্রকাশিত হয়। কেন্দ্রের উদ্যোগে মাসিক সেমিনার এবং প্রতি বছর দেব স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠিত হয়। গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দর্শন ও প্রগতি নামক একটি বাংলা এবং ‘Philosophy and Progress’ নামক একটি ইংরেজি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে৷ ইউনেস্কো ঘোষিত ২১শে নভেম্বর প্রথম দর্শন দিবস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ ও গোবিন্দ দেব দর্শন গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে পালন করা হয়৷
ড. দেব ছিলেন সহজ-সরল, আত্মভোলা ও ভীষণ সাদাসিধে । চিরকুমার হলেও, দু’টি ছেলে-মেয়ে কে দত্তক নিয়ে তিনি পালন করেছেন । পোষ্যদের দুজন দু’ ধর্মের হলেও, তিনি তাঁদেরকে শিখিয়েছেন তাঁর ভেতরে পুষে রাখা অমর সে বাণীটিই । শিক্ষকতাকালীন সময়ে তাঁর আশ-পাশের সবাই তাঁকে নিয়ে মুগ্ধ ছিল । তিনি বুদ্ধের জন্মবার্ষিকীতে যেমন অনর্গল বক্তৃতায় পারদর্শী ছিলেন। তেমনি পারদর্শী ছিলেন মুহম্মদ (স) এর জন্মবার্ষীকি তেও । তিনি মনে করতেন যে কোন ধর্মীয় স্থানে যাওয়ার অধিকার যে কারো আছে । নিজেকে মানুষ হিসেবেই তিনি মেলে ধরেছিলেন, কোন ধর্মের ডালে আটকা পরেন নি তিনি । তাঁর এরকম উদার মানসিকতা সত্যিই প্রশংসনীয় ।
ড. দেব এর পালিতা কন্যা রোকেয়া বেগম আর তার স্বামী তাঁর বাসায় থাকতেন। ২৫শে মার্চ, ১৯৭১ তারিখে রাতে সারারাত ধরেই তাঁর বাড়ির উপর গুলি বর্ষিত হয়েছে। ভোরের দিকে তিনি তার মেয়েকে বললেন : মা তুমি একটু চা কর। আমি ততক্ষণে ভগবানের একটু নাম করি। এ সময় দরজা ভেঙে পাকিস্তানী সেনারা ঘরে প্রবেশ করে । “কাঁহা মালাউন কাঁহা” বলে তারা প্রফেসর দেবকে খোঁজ করে। পালিতা কন্যা রোকেয়া বেগমের স্বামী গোবিন্দ চন্দ্র দেবকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন এবং সৈন্যদের মন গলানোর জন্য কলেমা পড়েন। কিন্তু এতে কাজ হয়নি। ড. দেব নিজেও দু’হাত ওপরে তুলে “গুড সেন্স গুড সেন্স” বলে তাদের নিবৃত্ত করতে চেয়েছেন। কিন্তু হাত কয়েক ব্যবধানে থেকে সেনাসদস্যরা ব্রাশ ফায়ার করে গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও রোকেয়া বেগমের স্বামীকে হত্যা করে। রোকেয়া বেগম আকস্মিক আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডে অচেতন হয়ে পড়ায় বেঁচে যান। ২৬ শে মার্চ বিকেলে জগন্নাথ হলের পশ্চিম পাশ (যেখানে তার লাশ ফেলে রাখা হয় ) ঘেঁষে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়া হয় হলের প্রভোস্ট ড. দেবসহ অন্যদের লাশ ।
---------------------------------------------
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা (১০ জুলাই, ১৯২০ – ২৭ মার্চ, ১৯৭১) একজন বাংলাদেশি বুদ্ধিজীবি ও শিক্ষাবিদ। তাঁর অন্যতম পরিচয় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া বুদ্ধিজীবীদের একজন।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতার জন্ম তৎকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের (বর্তমানের বাংলাদেশ) ময়মনসিংহ জেলায়। তাঁর পৈত্রিক নিবাস বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বানারীপাড়ায়। তাঁর বাবার নাম কুমুদচন্দ্র গুহঠাকুরতা, এবং তিনি পেশায় ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক।
১৯৩৬ সালে ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে আই.এসসি. কোর্সে ভর্তি হন। এক বছর সেখানে পড়াশোনা করার পর টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে তিনি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন এবং ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে আই.এ.-তে ভর্তি হন, এবং সেখান থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাশ করেন। এরপর তিনি ইংরেজি বিষয়ে ভর্তি হন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ১৯৪২ সালে তিনি বি.এ. (সম্মান) বা স্নাতক, এবং ১৯৪৩ সালে এম.এ. (মাস্টার্স) বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক অবস্থায় কর্মরত থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যার সময় তিনি ঢা.বি.-এর জগন্নাথ হলে আবাসিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বপালন করছিলেন। সেদিন তিনি পাকিস্তানী বাহিনীর দ্বারা গুলিবিদ্ধ ও আহত হন, এবং চারদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ মার্চ, ১৯৭১-এ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
----------------------------------------------------------
জহির রায়হান (আগস্ট ১৯, ১৯৩৫ – জানুয়ারি ৩০, ১৯৭২) একজন প্রখ্যাত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, এবং গল্পকার।
জহির রায়হান ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি তার পরিবারের সাথে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে দু’বার বিয়ে করেন: ১৯৬১ সালে সুমিতা দেবীকে এবং ১৯৬৬ সালে তিনি সুচন্দাকে বিয়ে করেন, দুজনেই ছিলেন সে সময়কার বিখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী।
জহির রায়হান বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তার সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫০ সালে তিনি যুগের আলো পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি খাপছাড়া, যান্ত্রিক, সিনেমা ইত্যাদি পত্রিকাতেও কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে প্রবাহ পত্রিকায় যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। চলচ্চিত্র জগতে তার পদার্পণ ঘটে ১৯৫৭ সালে, জাগো হুয়া সাবেরা ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি যে নদী মরুপথেতেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে এ দেশ তোমার আমার এ কাজ করার আমন্ত্রণ জানান; জহির এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬০ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কখনো আসেনি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র সঙ্গম নির্মাণ করেন (উর্দু ভাষার ছবি) এবং পরের বছর তার প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র বাহানা মুক্তি দেন। জহির রায়হান ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আমতলা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন। ভাষা আন্দোলন তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যার ছাপ দেখতে পাওয়া যায় তার বিখ্যাত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়াতে। তিনি ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেওয়ার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিত রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন। সে সময়ে তিনি চরম অর্থনৈতিক দৈন্যের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তার চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হতে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ তিনি মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে দান করে দেন।
জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানী আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মীরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি। মীরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।
-------------------------------------------------------
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী (২২শে জুলাই, ১৯২৬ – ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১) মননশীল প্রবন্ধকার, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের অংশ হিসাবে তিনি অপহৃত ও পরে শহীদ হন।
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বর্তমান বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ববঙ্গের) নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা বজলুর রহমান চৌধুরী ও মা মাহফুজা খাতুন। তিনি মাত্র নয় বছর বয়সে পিতাকে হারান। তাঁর মা মামলায় জয়লাভ করে তাঁদের পরিবারের সম্পত্তি রক্ষা করেন। ফলে মোফাজ্জল, তাঁর দুই ছোট ভাই এহতেশাম হায়দার ও লুতফুল হায়দার এবং ছোট বোন রওশন আখতার রাজিয়ার পড়াশোনা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে মামার আশ্রয়ে। ১৯৫৬ সালে সৈয়দা তাহমিনা মনোয়ারা নুরুন্নাহার-কে বিবাহ করেন। তাঁদের ঘরে ১৯৬৪ ও ১৯৬৭ সালে যথাক্রমে সুমন ও শোভন নামে দুই ছেলে হয়।
মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী নোয়াখালীর সোনাপুরের আহমদিয়া হাই ইংলিশ স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন ও মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ঢাকা কলেজ (তৎকালীন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ) থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেন। এরপর তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বাংলায় (সম্মান) ভর্তি হন। কিছুদিন পর এই কলেজ ত্যাগ করে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে ইংরেজি অনার্স পড়া শুরু করেন। কিন্তু বাংলা বেশি ভালবাসতেন বলে শান্তিনিকেতনে চলে যান ও সেখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস অনুসারে বাংলা (সম্মান) পড়তে থাকেন। ১৯৪৬ সালে তিনি নন-কলেজিয়েট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় অংশ নেন ও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। এ সাফল্যের জন্য তাঁকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় “সুরেন্দ্রনলিনী স্বর্ণপদক” প্রদান করে। পরে ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে আবারও স্যার আশুতোষ গোল্ড মেডেল দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ১০০ বছরের ইতিহাসে তাঁর মত এত বেশি নম্বর পেয়ে কেউ বাংলা (সম্মান)-এ ডিগ্রী অর্জন করেনি। ১৯৪৬-১৯৪৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যায়ে মাস্টার্স পড়া শুরু করেন। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র-ভবনের বৃত্তি লাভ করে সেখানে ফিরে যান ও ১৯৪৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করে “সাহিত্যভারতী” উপাধি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৪৯ সালের নভেম্বরে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী শান্তিনিকেন্তন ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন ও রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে পাণ্ডুলিপি রচয়িতা (script writer) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫০ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দেন। তিনি এসময় সেন্ট গ্রেগরিজ কলেজ (বর্তমান নটরডেম কলেজ)-এও খন্ডকালীন অধ্যাপনা করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন।
১৯৫৭ সালে তিনি ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (School of Oriental and African Studies)-এ ভাষাবিজ্ঞান অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি লাভ করেন। সেখানে দুই বছর গবেষণা করার পর কথ্য বাংলার শব্দের ছন্দোবিজ্ঞানের ওপর একটি অভিসন্দর্ভ লেখেন, কিন্তু তাঁর গবেষণার ধরন তৎকালীন মার্কিন ধারার ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণাপন্থার অতিমাত্রায় অনুসারী ছিল বলে এই অভিসন্দর্ভটি প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়নি। পরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলা একাডেমী থেকে এটি প্রকাশ করা হয়।
১৯৬৪ সালে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভাষাবিজ্ঞান পড়ার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর এ চেষ্টা সফল হয়নি।
১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়। একই বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা রীডার (পরবর্তীতে এ পদের নাম বদলে সহযোগী অধ্যাপক করা হয়) পদে নিযুক্ত হন।
১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী তাঁকে তাঁর কনিষ্ঠ ভাই লুতফুল হায়দার চৌধুরীর বাসা থেকে অপহরণ করে। এর পর তাঁর আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় ঐ দিনই তাঁকে হত্যা করা হয়।
--------------------------------------------------------
আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী (২৭শে নভেম্বর, ১৯২৫ – ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১) একজন বাংলাদেশী শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী। তিনি তৎকালীন ঢাকা জেলার মানিকগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ইংরেজ আমলের সরকারী কর্মচারী খান বাহাদুর আবদুল হালিম চৌধুরীর চৌদ্দ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয়। কবীর চৌধুরী তাঁর অগ্রজ, ফেরদৌসী মজুমদার তাঁর অনুজা।
মুনীর চৌধুরী ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (বর্তমান ঢাকা কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং ১৯৪৩ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স (১৯৪৬) এবং মাস্টার্স (১৯৪৭) পাস করেন, উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তিনি ছিলেন সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র। বক্তৃতানৈপুণ্যের সুবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের প্রথম বছরেই, ১৯৪৩ সালে, হলের সেরা বক্তা হিসেবে প্রোভোস্ট্স কাপ জেতেন। ১৯৪৬ সালে নিখিল বঙ্গ সাহিত্য প্রতিযোগিতায় সর্বাধিক সংখ্যক পুরষ্কার জেতেন। ছাত্রাবস্থাতেই এক অঙ্কের নাটক রাজার জন্মদিনে লিখেছিলেন, যা ছাত্র সংসদ মঞ্চস্থ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেই মুনীর চৌধুরী বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন, ফলে তাঁর পরীক্ষার ফলাফল এতে ব্যহত হয়। বামপন্থী রাজনীতিতে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততার কারণে তাঁকে সলিমুল্লাহ হল থেকে বহিস্কার করা হয়। একই কারণে পিতার আর্থিক সাহায্য থেকেও তিনি বঞ্চিত হন। এসময় তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের জন্য নাটক লিখে আয় করতেন। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যে প্রথম ছাত্রসভা হয়, তাতে তিনি বক্তৃতা করেন।
১৯৪৯ সালে মুনীর চৌধুরী খুলনার ব্রজলাল কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি কিছুদিন বাংলাও পড়িয়েছিলেন। ঐ বছর মার্চে তিনি ঢাকায় এসে রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে গ্রেপ্তার হন, তবে রাজনীতি না করার প্রতিশ্রুতিতে ছাড়া পান। একই বছর তিনি লিলি মীর্জাকে বিয়ে করেন। ১৯৫০ সালে তিনি ঢাকার জগন্নাথ কলেজে যোগ দেন এবং সে বছরই আগস্ট মাসে ইংরেজির অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্তিলাভ করেন। কিন্তু রাজনীতি থেকে বেশি দূরে থাকতে পারেন নি। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে পুলিশের ধাক্কা খেয়ে পড়ে যান। ২৬শে ফেব্রুয়ারি শিক্ষকদের প্রতিবাদ সভা আহ্বান করতে গিয়ে গ্রেফতার হন ও তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এসময় প্রায় দুই বছর তিনি দিনাজপুর ও ঢাকা জেলে বন্দী জীবনযাপন করেন। বন্দী অবস্থায় ১৯৫৩ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি কারাবন্দীদের অভিনয়ের জন্য লেখেন কবর নামের একাঙ্কিকা। ১৯৫৩ সালে বামপন্থী রণেশ দাশগুপ্ত জেলখানাতে ২১ ফেব্রুয়ারি উৎযাপনের লক্ষে মুনীর চৌধুরীকে একটি নাটক লেখার অনুরোধ জানান। এই অনুরোধের ভিত্তিতে তিনি নাটকটি রচনা করেন। এ নাটকটি তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক হিসেবে খ্যাত এবং এর প্রথম মঞ্চায়ন হয় জেলখানার ভেতরে, যাতে কারাবন্দীরাই বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
সঙ্গী কারাবন্দী অধ্যাপক অজিত গুহের কাছ থেকে তিনি প্রাচীন ও মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন, কারাগারে থেকেই ১৯৫৩ সালে বাংলায় প্রাথমিক এম এ পরীক্ষা দেন ও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। ১৯৫৪ সালে নিরাপত্তা বন্দী থাকা অবস্থায় এম এ শেষ পর্ব পরীক্ষা দিয়ে তিনি কৃতিত্বের সাথে বাংলায় মাস্টার্স ডিগ্রী পাস করেন।
১৯৫৪ সালের ১৫ই নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির অস্থায়ী প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালের জানুয়ারিতে মুহম্মদ আবদুল হাইয়ের প্রচেষ্টায় বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং আগস্ট মাসে বাংলা বিভাগে সার্বক্ষণিক চাকুরি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালের এপ্রিল মাসে তিনি বাংলার প্রভাষক হিসেবে চাকুরি স্থায়ী করেন। ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে রকাফেলার বৃত্তি নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ১৯৫৮ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে আরও একটি মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। সে বছর সেপ্টেম্বরে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬২ সালে অস্থায়ী রীডার পদে নিযুক্ত হন।
১৯৬৯ সালে মুহম্মদ আবদুল হাই অকালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর স্থানে মুনীর চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হন। ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত একটি ভাষাতাত্ত্বিক সম্মেলনে যোগ দিতে যান।
মুনীর চৌধুরী ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দী হন। বন্দী থাকা অবস্থায় তিনি তাঁর বিখ্যাত নাটক কবর রচনা করেন (১৯৫৩)। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের যে কোন ধরনের সংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। ১৯৬৬ সালে রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান প্রচারে পাকিস্তান সরকারের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালাকে রোমান বর্ণমালা দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে সে আন্দোলনের সমর্থনে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করেন
মুনীর চৌধুরী ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় বাঙলা উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে বাংলা টাইপরাইটারের জন্য উন্নতমানের কী-বোর্ড উদ্ভাবন করেন, যার নাম মুনীর অপ্টিমা। An Illustrated Brochure on Bengali Typewriter (1965) শীর্ষক পুস্তিকায় তিনি তাঁর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন এবং এই নতুন টাইপরাইটার নির্মাণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকবার পূর্ব জার্মানিতে যান।
মুনীর চৌধুরী ১৯৫৩ সালে কারাবন্দী অবস্থায় কবর নাটকটি রচনা করেন। ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত পূর্ববঙ্গ সরকারের ভাষা-সংস্কার কমিটির রিপোর্টের অবৈজ্ঞানিক ও সাম্প্রদায়িক বিষয়বস্তুর তীব্র সমালোচনা করে মুনীর চৌধুরী পূর্ববঙ্গের ভাষা কমিটির রিপোর্ট আলোচনা প্রসঙ্গে একটি দীর্ঘ ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৫৯ সালের ২৭শে এপ্রিল প্রবন্ধটি বাংলা একাডেমীতে পঠিত হয়। কিন্তু মুসলিম ধর্মবিশ্বাসে আঘাতের অভিযোগে সামরিক সরকারের কাছে তাঁকে কৈফিয়ৎ দিতে হয়। এরপর তিনি সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন ও বেশ কিছু মৌলিক ও অনুবাদ নাটক লেখেন। অনেকগুলি প্রবন্ধের সংকলনও প্রকাশ করেন। মীর মানস (১৯৬৫) প্রবন্ধ সংকলনের জন্য দাউদ পুরস্কার এবং পাক-ভারত যুদ্ধ সম্পর্কে লেখা সাংবাদিকতাসুলভ রচনা-সংকলন রণাঙ্গন (১৯৬৬)-এর জন্য সিতারা-ই-ইমতিয়াজ উপাধি লাভ করেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বাংলা বর্ণমালা ও বানান-পদ্ধতির সংস্কার প্রচেষ্টার প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত একটি রিপোর্টে প্রবন্ধ লেখেন এবং পরবর্তীতে এ বিষয়ক বিতর্কে সক্রিয় অংশ নেন।
১৯৭১ সালের মার্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুনীর চৌধুরী ফিরে আসার কিছুকাল পরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। তাঁর কিশোর ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চলে যায়। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেশে মে-জুন মাসে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে এবং জুলাই মাস থেকে কলা অনুষদের ডীন হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সহযোগী আল-বদর বাহিনী তাঁর বাবার বাড়ি থেকে অপহরণ করে ও সম্ভবত ঐদিনই তাঁকে হত্যা করে।
উল্লেখযোগ্য রচনাবলি
নাটক
রক্তাক্ত প্রান্তর (১৯৬২)
চিঠি (১৯৬৬)
কবর (১৯৬৬)
দণ্ডকারণ্য (১৯৬৬)
পলাশী ব্যারাক ও অন্যান্য (১৯৬৯)
অনুবাদ নাটক
কেউ কিছু বলতে পারে না (১৯৬৯); জর্জ বার্নার্ড শ-র You never can tell-এর বাংলা অনুবাদ।
রূপার কৌটা (১৯৬৯); জন গলজ্ওয়র্দি-র The Silver Box-এর বাংলা অনুবাদ।
মুখরা রমণী বশীকরণ (১৯৭০); উইলিয়াম শেক্স্পিয়ারের Taming of the Shrew-এর বাংলা অনুবাদ।
প্রবন্ধ গ্রন্থ
ড্রাইডেন ও ডি.এল. রায় (১৯৬৩, পরে তুলনামূলক সমালোচনা গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত)
মীর মানস (১৯৬৫)
রণাঙ্গন (১৯৬৬); সৈয়দ শামসুল হক ও রফিকুল ইসলামের সাথে একত্রে।
তুলনামূলক সমালোচনা (১৯৬৯)
বাংলা গদ্যরীতি (১৯৭০)
অন্যান্য
An Illustrated Brochure on Bengali Typewriter (1965)
১৯৮২ সাল থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত বাংলা একাডেমী থেকে আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় চার খণ্ডে মুনীর চৌধুরী রচনাবলী প্রকাশিত হয়। প্রথম খণ্ডে (১৯৮২) মৌলিক নাট্যকর্ম, দ্বিতীয় খণ্ডে (১৯৮৪) অনুবাদমূলক নাট্যকর্ম, তৃতীয় খণ্ডে (১৯৮৪) সমালোচনামূলক গ্রন্থাবলি এবং চতুর্থ খণ্ডে (১৯৮৬) ছোট-গল্প, প্রবন্ধ, পুস্তক সমালোচনা ও আত্মকথনমূলক রচনা প্রকাশিত হয়।
-----------------------------------------
সেলিনা পারভীন (৩১ মার্চ, ১৯৩১ – ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১) একজন বাংলাদেশী সাংবাদিক। তিনি কাজ করতেন সাপ্তাহিক বেগম, সাপ্তাহিক ললনা, ও শিলালিপি পত্রিকায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফেনী শহরের পৈত্রিক বাড়ীটি সরকার ক্রোক করে নিয়ে যাওয়ায় ১২ বছর বয়সী সেলিনাকে নিয়ে শিক্ষক বাবা মোঃ আবিদুর রহমান গ্রামে চলে যান। সেলিনা পারভীন তখন ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী ছিলেন এবং কবিতা-গল্প লিখতেন। খুবই রক্ষণশীল গ্রামে তার আর স্কুলে যাওয়া হল না। ১৪ বছর বয়সে তার অমতে গ্রামের এক প্রাত্রের সাথে বিয়ে দেয়ায় তিনি ঘর করলেন না। পড়তে চাইলেন, কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। ১০ বছর পর তালাক হয়ে গেল।
সেলিনা ঢাকায় চলে এলেন ১৯৫৮ সালে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল এ মেট্রনের চাকুরি পেলেন। কর্তৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় দুই বছরের মধ্যে চাকুরি ছেড়ে দিলেন। ১৯৬২ সালে আবার বিয়ে করেন এক রাজনীতিক কে। পরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কাজ করেছেন। নিজের সাময়িকী ‘শিলালিপি’ অনিয়মিত ভাবে বের করতেন।
১৯৭১ সালের ১৩ই ডিসেম্বর অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের মতো তাঁকেও বাসা থেকে আল বদরের কর্মীরা ধরে নিয়ে যায়। তখন তার ছেলে সুমনের বয়স ছিল ৮ বছর। ১৪ই ডিসেম্বর তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্যদের সাথে ঢাকার রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তাঁর লাশ পাওয়া যায়।
---------------------------------------------
শহীদুল্লাহ কায়সার (ফেব্রুয়ারি ১৬, ১৯২৬ – ডিসেম্বর ১৪, ১৯৭১) একজন বাঙালি লেখক ও বুদ্ধিজীবী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় সহযোগী আল-বদরের হাতে অপহৃত হন। ধারণা করা হয় যে, অপহরণকারীদের হাতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯২৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার মাজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিলো নাইম মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি অর্থনীতিতে সম্মাননা সহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন, কিন্তু ডিগ্রী লাভ করার আগেই পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটান।
শহীদুল্লাহ কায়সার সমসাময়িক রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বামরাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।
শহীদুল্লাহ কায়সার দুইবার বিয়ে করেছিলেন। তিনি প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যমন্ত্রী ও চিকিৎসক আর আহমেদের কন্যা জোহরা খাতুনকে বিয়ে করেন। বিবাহবিচ্ছেদের পরে শহীদুল্লাহ কায়সার ১৯৬৯ সালে পান্না চৌধুরীকে বিয়ে করেন। পান্না কায়সার ১৯৯৬-২০০১ সালের জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের একজন সাংসদ ছিলেন। তাঁদের দুইটি সন্তান, অমি কায়সার ও শমী কায়সার।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আলবদর বাহিনীর কজন সদস্য তাঁকে তাঁর বাসা ২৯ বি কে গাঙ্গুলী লেন থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর তিনি আর ফেরেন নি।
সাহিত্যকর্ম
সংশপ্তক, উপন্যাস (১৯৬৪)
সারেঙবৌ, উপন্যাস
পুরষ্কার তালিকা
আদমজী সাহিত্য পুরষ্কার (১৯৬২)
বাংলা একাডেমী পুরষ্কার (১৯৬২)
-----------------------------------------
তথ্যঋণঃ উইকিপিডিয়া। -
আজমান আন্দালিব১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ১৩:৩২
একটি দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় দেশের সম্পদ। স্বাধীনতা বিরোধী কুলাঙ্গাররা যখন বুঝতে পারল এ দেশকে স্বাধীনতা না দিয়ে পারবে না, তখনই আসল ষড়যন্ত্র হয়। একটি দেশকে মেধাশূন্য করতে পারলে দুর্বল নেতৃত্ব আসবে। সেই নেতৃত্বকে পঙ্গু করে রাখার সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকেই বুদ্ধিজীবী নিধন।
৭১ সালে জাতিকে মেধাশূন্য করার পর থেকে আজও আমরা জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের খরায় ভুগছি। এটা কি পাকবাহিনীর দোসরদের সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ফল নয়?
যুদ্ধাপরাধের এই বিচার কি আদৌ হবে??????????????????????????????????????????? -
ইফতেখার আমিন১৪ ডিসেম্বর ২০১০, ১৬:৫১
লজ্জা নাহি শরম নাহি, ব্যাথা লাগে মনে
কেমন সন্তান হইলাম রে ভাই, স্বাধীন বাংলাদেশে?
( এই কথাটা এই জন্য বললাম যে, আমার ধারণা জনগনের দাবিই হলো সরকারের ক্ষেত্রে দায়িত্ব, যদি তাই হয় তবে আমার দাবি কতটা?)
আইরিনকে শুভেচ্ছা।





নীতিমালা
ব্লগ বই
অভিযোগ
সাম্প্রতিক পোস্ট

ফনেটিক
এরকম ছবির দিদার পেলে দিলের মাঝে সুকুন মেলে:q
(রাজাকারদের কাছে)